২৫ অক্টোবর, ২০২৪

মুখোশের মেলা

 এই শহরে এখন মুখোশের মেলা,
প্রতিবাদের নামে সবাই চাটুকার, খেলা;
কবি, তুইও সেই ভিড়ে মিলাইলি গা?
সত্যের ভাষা ভুলে ঠোঁটে রাখলি মিথ্যে কথা!
তোর কলম ছিল আগুনের ফুলকি,
অন্যায়ের পিঠে মারবার এক কঠোর মুকী;
কিন্তু আজ, তোর কলম শুধু প্রশংসায় ভরা,
শাসকের গুণগানে কবিতার রঙ খসে পড়া!
মানুষের কান্না তোকে কাঁপায় না একটুও,
তুই শুধুই গাস অট্টহাস্যে উন্নতির ঢেউ;
যেখানে ক্ষুধার্ত শিশু মাটির পানে তাকায়,
সেখানে তুই গাস স্বপ্নের কথা, যার রং কেবল পলকা আর মলিন ঝলকায়।
আল্লাহ তো তোকে পাঠাল সত্যের হাতিয়ার করে,
তুই ধরলি সেই হাতিয়ার চাটুকারের শোভায়, সাজিয়ে তোরে;
সত্য যখন ডাকে, তুই সেদিকে ফিরিস না,
মিথ্যের আড়ালে খুঁজিস তোর কলমের অহংকার,
তুই একটা জগতের ফানা!
দিন আসবে, শাসকের মুখোশ পড়বে খসে,
তুই কোথায় মুখ লুকাবি, সেইদিন যে আসবে;
কলম তো তোর চাইবে ফিরে সত্যের ভাষা,
কিন্তু ততদিনে, সেও হারাবে সব শক্তির আশা।
তাই আজও বলি, ছেড়ে দে ঐ মুখোশের খেলা,
মানুষের কষ্টে তুই বাঁধ সত্যের মালা;
কবি, তুই যেন রয়ে যাস আলোর মতো খাঁটি,
মিথ্যের দাস নয়, তুই হবি সত্যের সাথী।
মুখোশের মেলা
______________ রশিদ ভাই 
পঁচিশ দশ চব্বিশ

The Anthem of a Nation - "We Are Accustomed"

Let me say right at the beginning—we are a fortunate nation! In this vast world, so many people are lost and confused. But us? We know exactly whom to follow, what words to echo, whom to praise! Absolutely clear. Leaders will come, leaders will go, but our attitude remains unwavering—we are accustomed.

A new era has just begun. Everything is fresh, new thoughts, new strategies. Wonderful! Forget everything the previous leaders said—now we must tune into the words of this new illustrious leader. He proclaims, "This time, we are on the right path." We close our eyes and respond, "Yes, indeed, we must go!" Judging which path is correct is not our concern. He who will dictate it is our guide.

Just a while back, we would hear, "The economy is shining like gold." Shining? Absolutely. Maybe the neighborhood stores are overflowing with gold for sale! Now, a new leader has arrived, declaring, "No, it’s not the economy; it’s time for social reform!" Ah, precisely. Our society needs reform—provided we can talk about culture without worrying about poverty, education, or healthcare.

The middle class is in heavenly bliss! Just fold your hands and sit tight, for with every change of leadership, new policies will flood in—why worry about bread and butter? But beware, asking questions is a dangerous game. “Who are you to question? Don’t you know your leader's words are the ultimate truth?” We immediately say, “Oh, forgive us, great leader! Accustomed as we are, we will adapt to the new truth before the next leader arrives.”

Lately, neighborhood gatherings aren't like they used to be. “Brother, the government is doing just fine. Isn’t your situation improving? Remember, they are working for us!” Years of witnessing our "progress" have made our eyes numb. Education, healthcare, good governance—perhaps just dreams for us. But still, we live in bliss, for we are always treated to fresh narratives.

So, there’s no need to worry about the future of this nation. We know, no matter which leader takes the helm, there’s only one rule to survival: “We are accustomed.”



---


২৪ অক্টোবর, ২০২৪

একত্রিত পৃথিবীর গল্প


একবারের কথা, পৃথিবীর প্রান্তে একটি ছোট্ট গ্রাম ছিল, যেখানে বসবাস করতো তিন বন্ধু: সারা, রাফি, এবং মিতা। তাদের মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব, কিন্তু বাইরের জগৎ ছিল ভিন্ন। যুদ্ধ, হানাহানি, এবং বিদ্বেষে ভরা এক পৃথিবীতে তারা অস্থিরতা এবং বিভাজন দেখে বড় হয়েছে। তাদের মনে একটিই স্বপ্ন ছিল—একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী, যেখানে সবাই মিলেমিশে থাকবে।

সারা ছিল একজন চিত্রশিল্পী। সে যখন তুলিতে রং লাগাতো, তখন প্রতিটি আকার ও রং যেন তার হৃদয়ের কথা বলতো। একদিন, সে একটি বিশাল গাছের ছবি আঁকল। গাছটি এত বিশাল ছিল যে এর শাখা-প্রশাখাগুলো সারা আকাশে বিস্তৃত ছিল। গাছটির নিচে, চারপাশে মানুষজন বসে হাসছিল, কথা বলছিল, তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সারা ছবিটি তৈরি করে উপলব্ধি করল, এই গাছের মতোই মানুষের ভালোবাসাও বিস্তৃত হতে পারে।

রাফি, বিজ্ঞানী, সবসময় নতুন চিন্তার সন্ধানে থাকত। তার মনে মনে চিন্তা ছিল, “কিভাবে আমি এই পৃথিবীকে একটি বৃহৎ পরিবারের মতো গড়ে তুলতে পারি?” সে সিদ্ধান্ত নিল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে একত্রিত হওয়ার উপায় বের করবে। সে নতুন নতুন উদ্ভাবন করতে লাগল, যা মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে। তার গবেষণাগারে, সে এমন একটি যন্ত্র তৈরি করল, যা মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া এবং সংযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

মিতা, একজন শিক্ষক, জানতো শিক্ষা হল সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি শিশুদের শেখাতে শুরু করলেন, "ভিন্নতা আমাদের শক্তি। নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ নয়, বরং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা থাকা উচিত।" তিনি শিশুদের মধ্যে একটি নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে লাগলেন, যাতে তারা বুঝতে পারে, একে অপরের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমে তারা সমৃদ্ধ হতে পারে।

একদিন, তিন বন্ধুর মধ্যে আলোচনা হল—তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য কিছু করতে হবে। তারা ঠিক করল, তাদের গ্রাম থেকে শুরু করবে। তারা গ্রামের মানুষদের সঙ্গে দেখা করে বলল, "আমাদের পৃথিবীকে একত্রিত করতে হবে। সকলপ্রকার অনাচার, যুদ্ধ, হানাহানি, এবং বিদ্বেষকে চির বিদায় জানাতে হবে।"

গ্রামের মানুষ initially ভীত ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা তাদের বিশ্বাস করতে শুরু করল। সারা, রাফি, এবং মিতা একটি উৎসবের পরিকল্পনা করলেন—একটি সমাবেশ, যেখানে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ একত্রিত হবে। সারা তার শিল্পকর্ম প্রদর্শন করবে, রাফি বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করবে এবং মিতা শিশুদের নিয়ে গান গাইবে।

বসন্তের দিনে, ফুলে-ফলে ভরা আকাশে, উৎসবটি শুরু হলো। মানুষ চারপাশ থেকে আসতে শুরু করল। নানা ভাষা, সংস্কৃতি, এবং ধর্মের মানুষ একসাথে মিলিত হয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

যখন সারা তার ছবি উপস্থাপন করল, তখন মানুষের হৃদয়ে এক নতুন আলো জ্বলে উঠলো। ছবিতে দেখা গেল, সব মানুষ একত্রিত হয়ে গাছের নিচে বসে আছে, এবং তাদের মধ্যে ছিল মৈত্রী ও সহযোগিতার শক্তিশালী সুর।

রাফি যখন তার গবেষণার কথা বলল, তখন মানুষের মধ্যে নতুন ধারণা জন্ম নিল—“আমরা সবাই একসাথে কাজ করতে পারি, আমরা যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে একত্রিত করি।” 

তার উদ্ভাবনগুলো মানুষকে নতুন সুযোগ প্রদান করছিল, যেখানে তারা তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে পারবে।

মিতা শিশুদের সঙ্গে গান গাইতে শুরু করল। “একসাথে আমরা আকাশে উড়বো, একসাথে স্বপ্ন দেখবো,” গানের কথাগুলো মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করল। গানটির সুরে সুর মিলে মানুষজন গাইল। তারা অনুভব করল, তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি হয়েছে—একটি একাত্মতা।

দিনটি চলে গেল, কিন্তু সেই রাতে এক নতুন সূর্যোদয় হলো। গ্রামে গড়ে উঠলো এক নতুন মানবিকতা—যেখানে মানুষ একে অপরকে সমর্থন করছিল। তারা বোঝাতে লাগল, একসাথে কাজ করলে তারা একে অপরের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।

এই উৎসবের পর, একের পর এক গ্রাম-দেশের পর দেশ থেকে মানুষ আসতে লাগল তাদের গ্রামে। তারপর সকল হানাহানি যুদ্ধ-বিগ্রহ দারিদ্র্য দুর্দশার আওয়াজ বাতাসে মিলিয়ে গেল। দুনিয়ার সকল মানুষ একত্রিত হয়ে শান্তির গান গাইতে লাগল। প্রতিটি হাসির মধ্যে একটি নতুন বর্ণিল রঙ যুক্ত হতে লাগল।

পৃথিবী হয়ে উঠল সারার অঙ্কিত বিশাল গাছের মতো, যার শিকড় ছিল গভীর, আর শাখা-প্রশাখা ছিল বিস্তৃত। মানুষ মিলেমিশে কাজ করতে লাগল, আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে লাগল। তাদের হৃদয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলো একটাই চেতনা... 

 “নিশ্চয়ই, আমরাই পারি আমাদের পরিবর্তন আনতে”

পৃথিবী একত্রিত হলো। আর কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো বিদ্বেষ নেই। প্রত্যেকে যার যার স্বাধীনতা উপভোগ করতে লাগল। তাদের মধ্যে প্রেম ও সহানুভূতি ছিল। তারা জানল, শান্তি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি জীবনযাত্রা—যেখানে সকলেই একসাথে, একটি বৃহত্তর পরিবারের মতো বাস করছে।

এই নতুন পৃথিবীতে, প্রতিটি মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশ নিত। তারা সবসময় মনে করত, "আমরা একে অপরের জন্য আছি, এবং সকলে মিলে এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে।"



x

নারী, আধ্যাত্মিক আলোর প্রতিচ্ছবি

 নারী, তুমি আল্লাহর নূরের মহাসমুদ্র,
তোমার গভীরতায় লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আদি রহস্য।
তুমি শুধু বাহ্যিক রূপের আবরণ নও,
তুমি তো সেই অনন্তকালীন আধ্যাত্মিক স্রোত,
যা ভাসিয়ে নিয়ে চলে আত্মার তৃষ্ণার্ত নৌকা।
তোমার হৃদয় এক রহস্যময় বাগান,
যেখানে ভালোবাসা প্রস্ফুটিত হয়,
মিলিয়ে দেয় আকাশ ও পৃথিবীর সকল বিভেদ।
তুমি সেই নিঃশব্দ ভাষা, যা বলে দেয় সৃষ্টি ও স্রষ্টার কথা,
তোমার অস্তিত্বেই তো রয়েছে মহাজাগতিক সুরের ধ্বনি।
যদি কেউ দেখেও তোমায় না দেখে,
তোমার অন্তর্গত আলো তার চোখ এড়িয়ে যায়।
তুমি যে সীমাহীন আত্মার প্রতিচ্ছবি,
তোমার সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিতে নয়, হৃদয়ের গভীরে।
তুমি সেই অনুরণিত সুর, যা বাজে হৃদয়ের অদেখা প্রান্তে,
তুমি সেই আলো, যা জ্বালিয়ে দেয় আত্মার সব অন্ধকার।
যখন প্রবৃত্তির জালে আটকে যায় মন,
তুমি তখন আলোর পথের দিশারী।
তোমার স্পর্শে মেলে আত্মার মুক্তির দ্বার,
তোমার প্রেরণায় জাগে আধ্যাত্মিক সূর্যোদয়,
যেখানে ভালোবাসার আলো মিশে যায় জীবনের অন্ধকার ছায়ায়।
নারী, তুমি তো আল্লাহর প্রেমের পরম স্পর্শ,
তোমার মাঝে ছড়িয়ে আছে তার সৃষ্টির মহাজাগতিক পরিকল্পনা।
তুমি সেই রহস্যময় গ্রন্থ, যা বুঝতে হলে
আত্মার গভীরে বুনতে হয় শুদ্ধতার বীজ।
তুমি শুধু এক ব্যক্তিত্ব নও, তুমি এক মহাসত্তা,
যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টি, প্রেম, এবং আল্লাহর প্রজ্ঞার সব ছোঁয়া।
তুমি সেই পূর্ণতা, যা ছুঁয়ে যায় আকাশের উচ্চতা,
তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসেই বয়ে যায় আল্লাহর স্মৃতি,
তুমি যে সেই সেতু, যা মিলিয়ে দেয় সৃষ্টির সূর্যোদয় আর আল্লাহর অনন্ত রাত।
তুমি সেই আলো, যে আকাশ আর মাটির মিলনে তৈরি করে এক মহাজাগতিক নৃত্য,
যেখানে প্রেমের উৎসার, এবং স্রষ্টার অমৃতবাণী মিশে যায় এক বিন্দুতে।

২২ অক্টোবর, ২০২৪

সভ্যতার আত্মহত্যা

 


একদিন সকালে পৃথিবীর মানুষ ঘুম থেকে উঠল এবং খেয়াল করল, তারা দাজ্জালের হাতে হাত রেখে শপথ করেছে। কেউ গোপনে, কেউ প্রকাশ্যে; কেউ নিজেদের বুঝে, কেউবা ভুলে। কিন্তু দাজ্জাল তো আর কোনো একক ব্যক্তি নয়, সে এক ছায়ামূর্তি, যার হাত আছে রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, পররাষ্ট্রনীতিতে—একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত করছে পৃথিবী জুড়ে।

মানুষগুলো চোখে দেখছে, কিন্তু মনে করছে তারা অন্ধ। তারা দৃষ্টি হারিয়েছে, কিন্তু বিশ্বাস করছে তারা সবই জানে। কেমন যেন একচোখা নীতির অধিকারী হয়েছে সবাই, যেখানে সত্যের দিকে তাকানোর শক্তি নেই, অথচ মিথ্যার পথ ধরে সোজা হাঁটছে।

অপ্রয়োজনীয় কথার খেলা...

রাজনীতিকরা বলে চলেছেন, “আমরা উন্নতি করছি, সভ্যতার শিখরে উঠছি।” আর মানুষ তা শুনছে, মাথা নেড়ে সম্মতি দিচ্ছে, কিন্তু সত্যটা জানতে চাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কারোর নেই। মঞ্চে বক্তারা বলছে, “অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আসছে,” অথচ পেছনে কুৎসিত লুটপাট চলছে। আর মানুষ তা জেনেও চুপ।

“আমাদের পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী,” এমন ঘোষণা দেয়া হচ্ছে মঞ্চে, কিন্তু পেছনে চলছে অস্ত্রের বাণিজ্য, যুদ্ধের প্লট। আর মানুষ তাতেই সম্মতি জানাচ্ছে, কারণ তারা নিজেরাই জানে না যে তারা আসলে শত্রুকে শক্তিশালী করছে। সভ্যতার শত্রু নিজেদের কাছেই! যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে পৃথিবীর শান্তি আনা উচিত ছিল, তা এখন ধ্বংসের প্রমাণপত্র হয়ে উঠেছে।

ষড়যন্ত্রের চতুর খেলা...

একদল চতুর মানুষ নিজেদের স্বার্থে পৃথিবীর মানুষকে নিয়ে খেলছে। তারা মানুষকে নিয়ে যুদ্ধের বাজার তৈরি করছে, নতুন নতুন শত্রু বানাচ্ছে। এই খেলাটা রাজনীতির অন্ধকার, যেখানে স্বার্থ ছাড়া কিছুই নেই। একবার যুদ্ধ বাধলে মানুষ মরছে, গৃহহীন হচ্ছে, কিন্তু চতুরদের তো কিছুই হচ্ছে না। তাদের কাছে মানুষ স্রেফ দাবার গুটি, যা সঠিক সময়ে বলি দেওয়া হবে।

মানুষগুলো চুপচাপ দেখছে, কেউ বলছে না, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে, বললেও কোনো লাভ নেই। কৌশলে সবাইকে অন্ধ করে রাখা হয়েছে। চতুরেরা তাদের নিজেদের ষড়যন্ত্রে এতটাই মগ্ন যে, তারা মানুষের ভবিষ্যত দেখতে পায় না, আর মানুষ তা মেনে নিয়েছে, যেন এটিই তাদের ভবিতব্য।

দাজ্জালের হাত শক্তিশালী করা

এই যে মানুষগুলো দাজ্জালের হাত শক্তিশালী করছে, কেউ নিজের স্বার্থে, কেউ ভয় থেকে চুপ থেকে—তাদের সবাই যেন নিজের অজান্তেই সভ্যতার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তারা দাজ্জালের জয়যাত্রা নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, আর ধ্বংস অনিবার্যভাবে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।

যখন শেষ হবে সব, তখন হয়তো মানুষ বুঝবে—নিজেদের সভ্যতাই নিজেদের হাতে ধ্বংস করেছে। কিন্তু ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে যাবে।


মানুষখেকোদের মহাকাব্য: এক মানবিক উপাখ্যান

একটা সময় ছিল, গ্রহটার নাম ছিল মানুষপূর—পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সূর্যের ধারে কাছেই। এই গ্রহের মানুষরা ছিল পৃথিবীর মানুষের মতোই, কিন্তু তাদের ইতিহাসে এক ভয়াবহ মোড় আসে যখন তারা এক অদ্ভুত অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাসটি তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। সেই অভ্যাসের নাম—মানুষখেকোতা।

শুরুটা হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। প্রথমে একদল বিজ্ঞানী আবিষ্কার করে বসলেন, মানুষের মাংস খেলে শরীরের ক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণে। তাদের গবেষণার ফলাফল সমাজে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। প্রথমে এই নতুন খাদ্যাভ্যাস শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ক্ষমতা, সম্পদ, এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের নতুন পন্থা হয়ে দাঁড়ায় মানুষের মাংস ভক্ষণ।

তারপর থেকে যা ঘটল, তা ছিল অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে এই ‘অভিজাত’ খাবার চুপিচুপি গ্রহণ করা হতো। ধনী, প্রভাবশালী আর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিযোগিতায় নামলো। তবে মানুষ খাওয়া তখনো কেবল একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় ছিল, যেন এটি ছিল কোনো গোপন শক্তি বাড়ানোর মন্ত্র।

কিন্তু একদিন, মানুষপূরের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী অধিকর্তা মন্ত্রী সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলো: "মানুষ মানুষের মাংস খেলে সে হবে অদম্য—অপরাজেয়। আর সেই মানুষই পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হবে।" রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে গেলো এই ঘোষণা। মানুষখেকোতা সমাজের মূলধারায় প্রবেশ করলো। ক্ষমতা দখলের নতুন মাত্রা যোগ হলো—যার হাতে মানুষ আছে, তার হাতে সব।

অল্পদিনের মধ্যেই সব নেতা, মন্ত্রী, কর্তা-ব্যক্তিরা এই নীতিতে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠল। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে—সবখানে মানুষ মানুষকে খেতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে এটিই হয়ে উঠল সবচেয়ে সহজ ও দ্রুতগতির ক্ষমতা অর্জনের পথ। পাড়া-মহল্লায়ও আর কেউ পিছিয়ে থাকলো না।

এমনকি মানুষখেকো পাঠ্যক্রম চালু হলো স্কুলগুলোতে। শিশুদের শেখানো হলো, কীভাবে ‘সুস্বাদু মানুষ রান্না’ করতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও এলো: "মানুষের কোন অংশ সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর এবং শক্তিবর্ধক?" শিক্ষার উদ্দেশ্য বদলে গেলো; মানুষ মানুষকে খেয়ে যে সভ্যতা নির্মাণ করে তার জন্য প্রস্তুত হতে হলো সবাইকে।

এরপর এল বিশ্বমানুষখেকোতা সম্মেলন। মানুষপূরের প্রভাবশালী সব রাষ্ট্র, জাতি, সম্প্রদায় একত্রিত হলো। এদের মধ্যে বৈষম্য ছিল শুধু এক জায়গায়—কে কত বেশি মানুষ খেতে পারে এবং ক্ষমতার কতটা কাছে যেতে পারে। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হলো, মানুষখেকোতা শুধু সামাজিক অভ্যাস নয়, এটি নতুন এক আদর্শ। ক্ষমতা দখলের জন্য, জাতি গঠনের জন্য মানুষকে খাওয়া হবে।

ধীরে ধীরে এই প্রথা ছড়িয়ে গেলো সবার মধ্যে। একদিন এক দল বলল, “মানুষ খাওয়াই তো বটে, তবে ভিন্নমতালম্বীদের খেলে সবচেয়ে বেশি শক্তি মেলে। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী এবং তাই তাদের মাংসেও অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকে।” এই ভাবনায় মানুষপূরের প্রতিটি মানুষ হয়ে উঠলো আরও নিষ্ঠুর, আরও হিংস্র। কারো কাছে ভিন্নমত মানেই ছিল মূল্যবান সম্পদ।

এভাবে দিন চলতে থাকলো। একের পর এক মানুষখেকোতায় সবাই মেতে উঠলো। যারা মানবাধিকারের কথা বলত, ন্যায়বিচার চেয়ে দাঁড়াত, তাদেরও সহজেই খেয়ে ফেলা হলো। কারণ শক্তির এই নতুন তত্ত্বের সামনে মানবিকতা মূর্তিমান উপহাস ছাড়া কিছুই নয়।

শেষ পর্যন্ত যা হলো তা হলো, পুরো মানুষপূর গ্রহে একজনমাত্র মানুষ অবশিষ্ট থাকলো। বাকিরা নিজেরাই নিজেদের খেয়ে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ধ্বংস করে ফেলল। শেষ মানুষটির নাম ছিল ফার্নান্ডো।

ফার্নান্ডো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। সে ছিল সেই পৃথিবীর শেষ মানুষ, যাকে খাওয়ার মতো সেখানে আর কেউ ছিল না। নির্জনতার ভেতর ফার্নান্ডো মুচকি হেসে বলল, "মানুষ তো মানুষকেই খেতে চায়। আর এখন, খাওয়ার মতো কাউকেই পেলাম না!"

শেষ মানুষ ফার্নান্ডো তার হাতের একমাত্র অস্ত্র দিয়ে নিজের রক্তে শেষ চুমুক খেলো। তারপর ফিসফিস করে বলল,

 "মানুষ খেয়েছি, এখন গ্রহের পালা।"

ফার্নান্ডোর সেই শেষ চুমুকে পুরো মানুষপূর ধ্বংস হয়ে গেলো, আর সেই গ্রহের ইতিহাসে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়—"মানুষখেকোদের মহাকাব্য"।

কিন্তু গল্পটা কি এখানেই শেষ হলো? আমরা কি মানুষপূরের এই কাহিনী থেকে মুক্ত? নাকি এই পৃথিবীতে, আধিপত্যের লড়াইয়ে, ভিন্নমতের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে, আমাদের ভেতরেও- কোথাও না কোথাও মানুষখেকোতার বীজ আছে?

আছে কি? 


১৮ অক্টোবর, ২০২৪

রক্তমাটির বটবৃক্ষ



বটবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে—মাটি আঁকড়ে ধরে,
শেকড় ছুঁয়েছে রক্তের ধারা, লাল মাটির রূপে।
ওরা আসে, কুড়াল হাতে, কেটে ফেলতে চায়,
তবু জানে না, এই গাছ কি সহজেই মরে যায়?

ওরা বলে, "ইতিহাস ভুলে যাও, নতুন বৃক্ষ রোপো!"
কিন্তু কীভাবে ভুলবে? শেকড় তো মাটির রসেই ভিজে।
ত্রিশ লাখ পাতা ঝরে পড়েছিল একদিন,
তাদের রক্তে শেকড় আজও জ্যান্ত—তুমুল বেদনায় কাঁদে।

ওরা চায় শিকল পরাতে, বটবৃক্ষের ডালে,
"মুছে দাও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর কথা ফেলে।"
কিন্তু বাতাসে যখন শ্বাস নেয় পাতা,
তখনও বাজে জয় বাংলার মন্ত্র, জেগে ওঠে আত্মা।

ওরা কুড়াল চালায়, তবু গাছটা রক্ত ঝরায় না,
ওরা জানে না, এ বৃক্ষ শেকড়ের গহীনে থাকে,
বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে শেকড় জেগে ওঠে দুর্নিবার,
পতাকা উড়ে, সবুজ পাতায় লাল সূর্যের বার্তা।

শকুনেরা আকাশে উড়ে, কিন্তু ছায়া তাদের ছুটে যায়,
এই গাছের ছায়ায় মাটি আর মানুষ মিলে হয় একাকার।
যতখুশি তোমরা ছুরি চালাও, কিন্তু মুছে ফেলতে পারবে না,
এ গাছের শেকড় চিরকালীন, এ গাছ অক্ষয় অমর।

তোমাদের ষড়যন্ত্র বালুর বাঁধের মতো ভাঙবে,
এই গাছের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে মুক্তির ইতিহাস,
এ গাছ মরে না, এ গাছ থেকে জন্ম নেয় নতুন স্বাধীনতা—
যে স্বাধীনতা কাটতে চাও, তাতে তোমার হাতে ফুটবে কাঁটা।