০৩ নভেম্বর, ২০২৪

মৃত বিবেক

 যে বিবেক একবার মরে যায়,
তার জীবন ঘিরে অন্ধকারের জাল
এ দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মৃত বিবেকের লাশ,
নীরব, নিঃশব্দে পচে যাচ্ছে আশা।

চারপাশে দেখো, ভয়াবহ নিরবতা,
জনতার গলায় আজ নেই কোনও গান
অধিকার তো মরে গেছে, সেসব কি আসবে ফিরে?
শাসকরা হানছে গোপনে, নীরব ইশারায় আমল
ক্ষমতার খেলা চলছে, অমানবিক সব বাণী,
গণতন্ত্রের নীলমণি হঠাৎ রূপ নিয়েছে স্বপ্নহীন।

দলিত আর নির্যাতিতের আর্তনাদে ভরে গেছে
সাধারণ মানুষের মৌনতা এখন গুরুতর রহস্য
কিন্তু জনতার মর্মে, বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে
গোপন কারাগারে কল্পনার মুক্তির রেখা
সত্যের মূর্তি গড়ে তুলবো আমরা
মৃত বিবেকের মাঝে, পুনর্জন্মের আহ্বান।

আশা জাগিয়ে তুলবো, জাগাতে হবে প্রতিশ্রুতি
সবার অধিকার রক্ষায়, আমরা হবো একসাথে
স্বাধীনতার বাতাসে, শুদ্ধ সুরে উঠবে গান,
মৃত বিবেকের লাশে, বাঁচবে নতুন প্রভাতের জ্যোতি।


[কবি মুতাকাব্বির মাসুদের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখলাম]

০২ নভেম্বর, ২০২৪

গল্প: উপদেষ্টার পরামর্শময় জগৎ

রহমান সাহেব একজন সৎ, দেশপ্রেমিক মানুষ। সরকার তাকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের জন্য নানান কার্যকরী পরামর্শ দিতে হবে। স্বপ্ন ছিলো, দেশকে এক নতুন রূপে গড়ে তোলার। দিনরাত কল্পনা করতেন, কীভাবে দেশের দারিদ্র্য দূর করবেন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করবেন, আর মানুষের জীবনমান উন্নত করবেন।

কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার পরপরই রহমান সাহেব বুঝতে পারলেন, বাস্তবতা তার ধারণার চেয়েও বেশি জটিল। প্রতিদিনই তিনি নানা রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্ভট পরামর্শের সম্মুখীন হতে থাকেন, যা দেশের উন্নয়নের বদলে সবকিছুকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিছু পরামর্শ এতটাই হাস্যকর যে, রহমান সাহেব নিজেও দ্বিধায় পড়ে যান, এসব তিনি মজার জন্য শুনছেন নাকি আসলেই তাদের কাছে এটাই পরিকল্পনা!

---

প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা:

নেতাদের একদল সকাল বেলা উপদেষ্টা কক্ষে হাজির। তারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন, তাদের এক দারুণ আইডিয়া আছে।

নেতা: "উপদেষ্টা সাহেব, দেশের জনগণ খুব চাপের মধ্যে আছে। তাদের একটু আনন্দ দিতে প্রতিদিন বিনামূল্যে নাটক-সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। প্রতিমাসে দুইশো জিবি ফ্রি ডাটা দিয়ে দেন। দেখবেন, এতে তারা সব ভুলে যাবে, আর আমাদের মাথাও ঠাণ্ডা থাকবে!"

রহমান সাহেব: "বিনোদন ব্যবস্থা ঠিক আছে। কিন্তু দেশের সমস্যাগুলো তো আসলে সমাধান করা দরকার। শুধু ভুলিয়ে রাখলে কি উন্নয়ন সম্ভব?"

নেতা: "উন্নয়ন? আরে উপদেষ্টা সাহেব, আমরা তো মনে করি জনগণ খুশি থাকলেই উন্নয়ন হয়ে যায়!"

রহমান সাহেব বিস্মিত হয়ে ভাবেন, মানুষ এভাবে দেশ চালাতে চায়!

---

দ্বিতীয় দিনের অভিজ্ঞতা:

পরদিন আরেক দল নেতা এলো। এবার তারা উন্নয়নের নামে চমকপ্রদ এক পরিকল্পনা নিয়ে হাজির।

নেতা: "দেশের উন্নয়নের জন্য এমন কিছু প্রকল্প হাতে নেন যা কখনও শেষ হবে না। এর ফলে সবাই ব্যস্ত থাকবে, মজুরের পেটে ভাত থাকবে, আর সবসময়ই উন্নয়নের ধোঁকা থাকবে!"

রহমান সাহেব: "কিন্তু প্রকল্প শেষ না হলে দেশবাসী আসলে কী উপকার পাবে?"

নেতা: "উপদেষ্টা সাহেব, আপনার চিন্তার চেয়ে আমাদের কার্যক্রম ঢের বড়! দেখুন, জনগণ তো কাজে ব্যস্ত থাকবে, দেশের অর্থনীতি চাঙা হবে!"

উদ্ভট এই যুক্তিতে রহমান সাহেব আবারো হতবাক হয়ে যান।

---

তৃতীয় দিনের অভিজ্ঞতা:

এবার আরেক নেতা তাকে পরামর্শ দিলেন রাস্তাঘাট উন্নয়নের।

নেতা: "উপদেষ্টা সাহেব, প্রচুর রাস্তা বানাবেন, কিন্তু এমনভাবে বানাবেন যেন সেটা গাড়ি চলার জন্য না হয়ে হাঁটার জন্য হয়। এতে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। আর জনগণ হাঁটতে গিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবন পাবে!"

রহমান সাহেব: "তাহলে তো কোনো যানবাহন চলবে না! মানুষ দূরের কাজও কি হেঁটেই করবে?"

নেতা: "এটাই তো উন্নয়ন, উপদেষ্টা সাহেব! স্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রকল্প!"

রহমান সাহেব মনে মনে ভাবলেন, এভাবে চলতে থাকলে জনগণ বুঝি সভ্যতা থেকেই পিছিয়ে যাবে।

---

চতুর্থ দিনের অভিজ্ঞতা:

আরেক নেতা আরও মজার একটা পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হলেন।

নেতা: "জনগণের ঘুমানোর সময় কমিয়ে দেন। ঘুমকাতুরে অলস  জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এদের ঘুমানো কমিয়ে দিলে পরিশ্রম বাড়বে আর জাতি আরও কর্মঠ হবে।"

রহমান সাহেব: "ঘুম তো মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এতে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে।"

নেতা: "অসুবিধা নেই, একদিনে মানুষ মরে না! বহুদিন ধরে খেটে খেটে মরবে"

রহমান সাহেব (হতাশ হয়ে): "আপনাদের পরামর্শ শুনে মনে হচ্ছে, দেশকে এগিয়ে নিতে নয়, বরং এক জায়গায় আটকে রাখাই আসল লক্ষ্য।"

---

কিছুদিনের মধ্যেই রহমান সাহেব বুঝতে পারলেন, এভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। সব নেতারাই কেবল তাদের নিজেদের স্বার্থে কাজ করছে, আর তিনি চেষ্টা করছেন দেশের কল্যাণে কিছু একটা করতে।

শেষমেশ রহমান সাহেব একান্তে বসে বলে উঠলেন,

"আমি দেশকে ভালো কিছু দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখানে তো দেখছি, সঠিক পরামর্শের চেয়ে উল্টোপাল্টা পরামর্শে ঘেরা হয়ে আছি। এভাবে চলতে থাকলে দেশ নয়, বরং দিশাহীন অবস্থায় পড়ে থাকবে!"

অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, কিছু সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষকে নিয়ে আলাদা একটি দলের মাধ্যমে উন্নয়নের কাজ শুরু করবেন। সত্যিকার অর্থেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে হলে, সঠিক চিন্তাধারার মানুষদের সহযোগিতাই জরুরি।

মনে মনে তিনি বললেন,

"দেশের উন্নয়ন শুধু পরামর্শে নয়, দরকার বাস্তবায়নের সৎ ইচ্ছা। হয়তো একদিন এসব বাধা পেরিয়েও সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।"


বেশকিছু দিন, এভাবেই কেটে গেলো... 

রহমান সাহেব প্রতিদিনের উদ্ভট পরামর্শ আর রাজনৈতিক বাধায় বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। বরং একদিন তিনি ভাবলেন, “যারা সত্যিই দেশকে ভালোবেসে কিছু করতে চান, তাদের নিয়ে একটা নতুন দল গঠন করতে পারলে কেমন হয়?”

এই ভাবনা থেকেই রহমান সাহেব সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সৎ, দায়িত্বশীল এবং দেশপ্রেমিক মানুষদের খুঁজে বের করতে শুরু করলেন। দিন দিন তার আশেপাশে অনেকেই এসে যোগ দিতে শুরু করলেন। এদের মধ্যে কিছু তরুণ উদ্যমী ব্যক্তি, কিছু অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, আবার সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষও ছিলেন। এভাবে একটা নতুন দল গঠন হলো, যার একমাত্র লক্ষ্য হলো— দেশের উন্নয়ন, সত্যের পথে প্রতিষ্ঠা, আর মানবতার কল্যাণ।

---

তাদের পরিকল্পনা ও কাজ:

নতুন দলটি প্রথমেই একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবসম্মত সংস্কার আন্দোলন শুরু করলো। স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি— প্রতিটি খাতে ধীরে ধীরে বাস্তবমুখী উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলো। দেশের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেগুলোকে সামনে রেখে বাস্তবসম্মত সমাধানের উপায় বের করা হলো।

কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্কার:

*** শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য নীতি সংস্কার এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।

*** স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ।

*** পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প।

*** কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন।

*** পরিকল্পিত উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থা। মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে সুষম বণ্টন পদ্ধতি প্রয়োগ করা।

*** আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করলেন। একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলেন।

সাধারণ জনগণ এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়ে গেল। কারণ, এবার তারা দেখলো সত্যিকারের পরিবর্তনের আশা। এই দলের প্রতিটি সদস্য নিষ্ঠা ও সততার সাথে কাজ করছিলেন, এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

---

ফলাফল:

কিছু বছরের মধ্যেই দেশ একটি আধুনিক, উন্নত, ও সমৃদ্ধ সভ্য দেশে পরিণত হলো। সকল নাগরিকের জীবনমান উন্নত হলো, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলো, এবং দেশের ভেতর এক সম্প্রীতির বাতাস বইতে লাগলো। রহমান সাহেব তৃপ্তি নিয়ে ভাবলেন, “দেশের জন্য কাজ করার সঠিক পথ এটাই। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব। সকল দলের ভালো মানুষগুলোই আসলে দেশের আসল শক্তি।”

গল্পের শেষ বাণী:

“সৎ চিন্তা আর সততার শক্তিতে গড়ে ওঠা এক নতুন দেশ— সত্যিকারের স্বাধীনতা ও উন্নয়নের পথ দেখালো।”

আলোর রেখা

অস্তিত্বের ছাই হয়ে ঝরে যাই নক্ষত্রবিহীন রাতের বুকে,
আমার নামহীন আভাস লেগে থাকে বাষ্পে, কুয়াশায়,
তবু রেখে যাই কিছু নীরব রক্তাক্ত সুর—
যা শোনে শুধু মাটি আর আকাশের আদি মর্মর।
হয়তো ক'দিন ভাঙবে স্বজনদের করুণ কণ্ঠ,
তাদের চোখের কোণে জমে থাকবে নোনা জলের রেখা,
তারপর জীবন তার চিরন্তন চক্রে ঘুরে যাবে,
যেন শূন্য আকাশে ভেসে যাওয়া এক কণা ধূলির নাচ।
আমি, আমার নাম—স্মৃতির পলকেই মিলিয়ে যাবে একদিন,
কিন্তু আমার সৃষ্টি অমরাবতীর ফুলের মতো অক্ষয় হবে,
প্রতি ছন্দে, প্রতি অক্ষরে থাকবে আমার স্পর্শের নির্গল,
যেন জলের মাঝে ভাসা এক টুকরো অস্তরাগের ছায়া।
এই পৃথিবী, একদিন তুমি ফিরবে আলোয় স্নাত নতুন পথে,
আমার সৃষ্টির ঝলক হয়ে সুরের বুননে বেঁধে রাখবে প্রাণ,
আমি হারিয়ে যাবো, তবু কালের মাঝে তুমুল হয়ে রবো—
বৃষ্টির ফোঁটায় যেমন মেঘের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর থাকে।
যখনই রাত হবে গভীর, যখনই নিস্তব্ধ হবে বাতাস,
আমার অস্ফুট প্রণোদনা ছুঁয়ে যাবে তোমার হৃদয়ের স্তর,
অজস্র যুগান্তরের পরেও অনুভবে লেগে থাকবে আমার কণ্ঠের আভা—
অস্তিত্বের আকাশ হয়ে, চিরকালীন আলোর রেখা হয়ে।

উপাখ্যান: দণ্ডমুণ্ডের দখল

অনেক বছর আগে, এক সমাজে কিছু চোর ঘাঁটি গেড়েছিল। দিনের আলোয় তারা সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করত, কিন্তু রাত গভীর হলেই তাদের আসল চেহারা প্রকাশ পেত। ঘরের মায়েরা শিশুদের বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখত; মাঠে কাজ করা মানুষগুলো টুকিটাকি জিনিস, এমনকি জীবিকা হারানোর ভয়ে আতঙ্কে থাকত। চোরেরা তাদের কাজ এত নিখুঁতভাবে করত যে কেউ তাদের কৌশল বুঝতে পারত না।

একসময় সেই সমাজের মানুষরা সিদ্ধান্ত নিল, আর নয়। তারা কোনো উপায় না পেয়ে ডাকাতদের সহায়তা নিল। ডাকাতেরা চোরদের চেয়ে আরও বেশি ভয়ঙ্কর, তাদের নির্মমতায় মানুষ আতঙ্কিত হলেও, এবার যেন আর কোনো উপায় ছিল না। গ্রামবাসী মনে করল, হয়তো এভাবে চোরদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

ডাকাতেরা সমাজে প্রবেশ করল যেন ত্রাণকর্তা হিসেবে। চোরদের মোকাবিলা করতে তারা পুরো সমাজকে ভয়াবহ চাপে রেখেছিল। একটা সময় চোরেরা ভয় পেয়ে পালাতে বাধ্য হল। মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারা ভাবল, চোরেরা বিদায় নিয়েছে, এখন শান্তি আসবে।

কিন্তু খুব অল্প সময়েই গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল যে তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল তা ছিল মরীচিকা। চোরদের বিদায় করতেই ডাকাতেরা সমাজের ওপর এক নতুন মাত্রার অত্যাচার আর শোষণ চাপিয়ে দিল। তারা নিজেদের নিয়মে সমাজ চালাতে শুরু করল, নিজেদের জন্য আইন তৈরি করল, আর অন্যদের উপর চাপিয়ে দিল। তাদের সন্ত্রাস সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেল। মানুষদের মুক্তির স্বপ্ন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো।

ডাকাতদের শাসনে সমাজের প্রতিটি মানুষ ক্রমেই হারিয়ে ফেলল তার জীবনের আশা। শিশুরা জন্মের সাথে সাথেই এক অদৃশ্য শৃঙ্খলের দাস হয়ে গেল, নারীদের সম্মান আর পুরুষদের সাহস হরণের মাধ্যমে তারা পুরো সমাজকে পঙ্গু করে রাখল। দিনের পর দিন এভাবে চলতে লাগল। ঘরে ঘরে কান্না, রাস্তায় দুঃখভরা চোখ। প্রত্যেকেরই মনে ছিল শুধুই লজ্জা, অপমান, আর অসহায়ত্বের চিহ্ন।

একসময় সমাজের মানুষ বিদ্রোহ করতে চাইল। তাদের চোখে তখন আর কোনো ভয় ছিল না, বরং ছিল শুধুই এক মরিয়া সাহস। পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ সবাই একসঙ্গে জেগে উঠল। তারা ডাকাতদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। নিজেদের সমস্ত শক্তি, সম্মান, আর স্বপ্ন নিয়ে তারা এই ভয়ংকর শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মানুষদের ঐক্যের সামনে ডাকাতরা বেশিদিন টিকতে পারল না। তারা লজ্জিত, অপমানিত হয়ে সমাজ থেকে বিতাড়িত হলো।

কিন্তু এ মুক্তির উৎসব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ডাকাতদের বিদায়ের পর সমাজে এক অদৃশ্য শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াল। সে ছিল একজন দূরদর্শী মাস্টারমাইন্ড, যাকে সবাই আন্তর্জাতিক ডন হিসেবে চিনত। সে দূর থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত, কারও সামনে আসত না। প্রথমে কেউ বুঝতেই পারল না যে সমাজের দণ্ডমুণ্ড এখন কার হাতে। সে জটিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষকে তার শাসনের অধীনে আনল, যেন প্রতিটি মানুষই তার নীরব দাস।

ডনের শাসনে সমাজের মানুষ যেন দিন দিন আরও হারিয়ে যেতে লাগল। তাদের চোখের স্বপ্নগুলো শুষে নিয়েছিল ডন; তাদের মুখে হাসি ফিরল না, বরং প্রতিটি মানুষের চোখে জমা হতে থাকল নিস্তেজ অশ্রু। শিশুদের শৈশবের রঙ হারিয়ে গেল, নারীদের সম্ভ্রম তিরোহিত হলো, আর পুরুষদের সাহস নিঃশেষ হয়ে গেল। মানুষের কোনো অধিকার ছিল না, শুধু ছিল এক অকথ্য শৃঙ্খলে বেঁচে থাকার দায়।

ডনের কঠোর শাসনে, সমাজ এক বিশাল মৃত প্রান্তরে পরিণত হলো। তাদের ইতিহাস মুছে দেওয়া হলো, সংস্কৃতি ধ্বংস হলো, আর মানুষদের আত্মায় জন্ম নিলো শুধুই হাহাকার। একসময় সমাজটি ভেঙে পড়ল; সেখানকার মানুষরা ধীরে ধীরে বোঝা হয়ে দাঁড়াল এক অপূরণীয় শূন্যতার মাঝে। তাদের বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মাঝে পার্থক্য যেন মিলিয়ে গেল।

তাদের আর মুক্তির আশা রইল না, আর রইল না সেই সমাজের কোনো ভবিষ্যৎ—শুধু রইল এক নিঃসঙ্গ অতীত, এক অন্ধকারময় ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি। 


খাঁচা


ভুলেও মুখ খুলো না,
তুমি নিয়মের খাঁচায় বন্দি,
যেন পাখি, যাকে সাজানো
গয়না দিয়ে বাঁচিয়ে রাখি।
শব্দগুলো হয়ে গেছে ভারী
প্রশ্নের তরবারি জমে রয়!
যে কথা বলার সাহস নেই
তাতেই তো সত্য ছন্দময়।
একদম চুপ, এটাই যে নিয়ম
জলরাশির স্রোতে ভেসে যাও
স্বপ্নের জলকণ্ঠে চুপচাপ,
নিয়মের দড়িতে বাঁধা রও!
চোখে দেখে যেও তো সাদা
মেঘেরা যখন কালো ছায়া
অথবা বজ্রপাতে ভেঙে পড়লে
নিয়মে লিখে যাবে, "বড় পণ্ডিত!"
এটাই যে সমাজের সত্য
সব কিছুই যে পালটে গেছে
মুখ খুললেই ভেঙে পড়বে
গড়া প্রতিমা, গড়া ঈশ্বর!
হাতের তালুতে অন্ধকার
মুখে কোনো ভাষা নেই—ভয়
পাখি তুমি, চুপ থাকা পাখি
নিয়মের সুরে বেঁচে থাকো।
তুমি ভুলেও মুখ খুলো না,
তোমার বুকের ভেতর স্রোত,
 লুকানো রয়েছে কান্না?
বেশ, নিয়ম মেনে কাঁদতে পারো,
কিন্তু, কখনো চিৎকার করোনা।

০১ নভেম্বর, ২০২৪

বিষবৃক্ষ

 
ওরা বলে, “ওরা তোমার নয়, ওরা পর”—
ওরা ধর্মের নামে দেয়াল তোলে, আর বিভেদের বিষ ঢেলে দেয়।
কিন্তু এই মাটি জানে, এই ভাগ আর ভুলের জাল—
তোমার শত্রুদেশ নয়, তোমারই বুকে বাসকারী বুনেছে এই সংকটের কাঁটা।
পাকিস্তান ভেঙে যে জন্ম তোমার, সে কি কেবলই সীমারেখা?
যে পতাকা রক্তে রঙিন, সে কি খুঁজেছে নিজেরে কোনো ধর্মের ঘেরাটোপে?
এ পতাকা তো এক জননী, তার প্রতিটি সন্তানেরে নিয়ে গড়েছে স্বদেশ।
তবু কেনো বিভক্ত করো তার বুক, কেবলই নেতার পকেট ভরার খেলা?
মাটি শোনায় ইতিহাস, যে পথিক শুনতে চায়—
“হিন্দু-মুসলিম-আদিবাসী, এরা তো আমারই রক্তের গল্প।
যারা বলে বিভেদে মুক্তি, তারা বীর নয়, তারা প্রতারক;
শিকড়হীন আত্মা দিয়ে, ইতিহাসে স্থান পাবার অধিকার তারা রাখে না।”
তুমি যখন মিথ্যার নামে তুলে নাও তলোয়ার,
এই মাটি তখন কাঁদে, আর পতাকা হয় বিবর্ণ।
সেই রাজনীতির ক্রীতদাসেরা তো ক্ষমতার চাবুক ঘোরায়,
আর তোমার নিঃস্ব হৃদয়ে রেখে যায় বিভেদের ছাপ।
জাগো, দেশবাসী, জাগো, এখনো যদি স্বজাতির স্বর না শুনো—
এই মাতৃভূমি ফিরে যাবে কাল পুরনো অন্ধকারের অতলে।
তোমার স্বাধীনতা একে একে হারাবে তার অর্থ, তার রূপ,
আর আস্তাকুঁড়ে হারাবে বীরত্ব, জন্মাবে শুধু অভিশাপ।
এখনো যদি চোখ না খোলো, আসবে প্রতিশোধের দিন—
নিশ্চয়ই একদিন ঐ দালালদের মুখোশ খসে পড়বে, 
আর তোমার মাটি ফিরে পাবে তার কণ্ঠস্বর।
এই মাটি, এই পতাকা—এ তো তোমারই আত্মার রূপ;
বুকে ধরো একে, বিভেদ নয়, সম্মিলনই সত্য বীরের পরিচয়।