কে বলেছে উপরওয়ালার তরফ থেকে দেবদূত ফেরেশতা আসে না? এই দেশের মাটিতে যুগে যুগে তারা এসেছেন। শুধু সাদা পাখা আর সোনালী আবরণে নয়—মাটির গন্ধে, রক্তে ভেজা বীরত্বে আর মানুষের নিষ্ঠায় মিশে আছেন তারা। এই বাংলার মাটিতেই রয়েছেন সেই সকল দেবদূত, যাদের কেউ কখনো বলেছে বীর মুক্তিযোদ্ধা, কেউ শহীদ, কেউ কৃষক, কেউ শিক্ষক—যারা কেবল নিজের প্রয়োজনে নয়, দেশের জন্যই নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সেই ১৯৭১ সালে যখন পুরো দেশ মৃত্যুর ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল, তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা হন সত্যিকারের দেবদূত। তাদের হাতে ছিল না কোনো অলৌকিক ক্ষমতা, বরং একটি দৃঢ় মনোবল আর অসীম সাহস, যা দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে শেখায়। বুলেটের আওয়াজ আর শত্রুর রক্তচক্ষুর সামনে, যখন এক একটি জীবন নিভে যাচ্ছিল, তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যে মানুষগুলো কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দেশের সম্মান আর স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞা, তারা তো এই মাটির ফেরেশতা। তারা স্বর্গ থেকে না এসেও হয়ে উঠেছেন এই দেশের মাটি আর মানুষের রক্ষাকর্তা। তাদেরই প্রাণের দামে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা, পেয়েছি মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার।
গ্রামের প্রান্তরে সেই কৃষক, যার ঘামে ভেজা মাটি আর যার ফসলের প্রান্তর আমাদের খাবার জোগায়, তিনিও এক অবিচল ফেরেশতা। যুদ্ধ শেষে যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে এই দেশটা তাঁর পরিশ্রমে ফসলি হবে, সমৃদ্ধ হবে। সেই কৃষক নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে, কষ্টের কাস্তে হাতে মাটি খুঁড়ছেন। আর ভোরবেলার আলোয় তার চোখে ঠিকরে ওঠে এক মহাজাগতিক জ্যোতি। এভাবেই প্রতি প্রজন্মে মুক্তিযোদ্ধার আদর্শকে নিজের কাজের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি।
আর আমাদের সেই শিক্ষকরাও রয়েছেন—যারা ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে নীরবে প্রজন্ম তৈরি করেন। প্রতিটি শিশুকে স্বাধীনতার স্বপ্ন আর ন্যায়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। তারাও এই দেশের একেকজন দেবদূত, যারা অন্ধকার সমাজের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখছেন।
হাসপাতালের করিডোরে ক্লান্ত তবুও নিবেদিতপ্রাণ ডাক্তারের দলও তো সেই মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই, জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজে নিয়োজিত। এরা নিজেরা দেবদূতের মতো নিঃশব্দে সেবা দিয়ে যান।
আমাদের এই মাটিতে থাকা প্রতিটি প্রকৃত মানুষের মাঝেই রয়েছেন অসংখ্য দেবদূত—যারা নামহীন, নিঃশব্দ, ত্যাগী এবং সাহসী। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তারা কোনো খেতাব বা সম্মানের জন্য নয়, নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে এই মাটিকে রক্ষা করেছেন। তারা শুধু মুক্তিযোদ্ধা নন, তারা আমাদের সত্যিকারের ফেরেশতা, যারা জাতির জন্য একবার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর আজও এই মাটির প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বেঁচে আছেন।
এই মাটির প্রত্যেকটা ঘামে ভেজা কণা, প্রতিটি রক্তের বিন্দু আর প্রত্যেকটি শুদ্ধ হৃদয় আমাদের সেই ফেরেশতাদের সম্মান জানায়, যারা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অমর হয়ে আছেন। আসলেই, কার সাধ্য আছে দাবি করার যে ফেরেশতারা আসে না?
$
দেবদূতদের দেশে
_______________ রশিদ ভাই
ছাব্বিশ দশ চব্বিশ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন