১৩ অক্টোবর, ২০২৪

তিস্তার চর


এবার বুঝি দুর্ভাগার শিকে ছিঁড়ল, হাফিজ পেয়েছে একটা ভাল ইনকামের সুযোগ। জীবনে অভাব-অনটন কী, সেটার বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। সেই প্রাইমারি স্কুলে যাবার প্রথম দিন থেকে সে দেখেছে দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা। যদিও তখন এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই ছিল মঙ্গাপীড়িত।

স্কুলের দিনগুলোতে দারিদ্র্যের কারণে স্কুলড্রেসও ছিল না তার। কতবার না বেতের মার খেয়েছে সেই টেকো মাস্টারের কাছে, এসবের কেউ হিসেব রাখেনি। এসএসসি পাশ করতে করতে সে বহুবার বলেছে—"এই টেকচাঁদের বুকে তো কোনো মায়া নেই। থাকলে অন্তত বিয়েসাদি করত, একটা বাচ্চাকাচ্চা থাকলে হয়ত সন্তানের মায়া বুঝত।" মাস্টার সাহেব ভালো মানুষ হলেও, এই টাকের কারণে তার বিয়ে হয়নি।

হাফিজের ছোটবেলা কেটেছে চরম অভাবের মাঝে। রাতে গমের আটার রুটি, সকালে কাউন, ঢেমশীর গুড়ো, আর দুপুরে ভাগ্যে জুটত ভাত। বড় দুই ভাই কখনো ধরলা বা সতী নদীতে মাছ ধরলে সেদিন সবার একটু বেশি করে খাওয়ার সুযোগ হতো। কিন্তু মাছ আসলেও ভাত মিলত না পর্যাপ্ত। তার বাবার আয়ের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। যদিও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, তবে ৪০০ বিঘা জমি তিস্তা নদীর গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার গল্পটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বাবার মুখে শোনা এ গল্পে হাফিজ এবং তার বড় দুই ভাই বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পায়।

বড় দুই ভাই অভাবের কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেনি, এখন স্টেশনের পেছনে নিজেদের ছোট রুটির দোকানে কাজ করে। আর হাফিজ, এই পরিবারের তৃতীয় সন্তান, তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে। বাবার স্বপ্ন—এই ছেলেই একদিন পরিবারের সম্মান ফিরিয়ে আনবে। সবারই বিশ্বাস, হাফিজই তাদের পরিবারের জীয়নকাঠি হয়ে উঠবে।

এবার হাফিজ ভর্তি হয়েছে কারমাইকেল কলেজে, ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স পড়ছে। পড়ালেখায় বরাবরই তার মাথা ভালো, আর এই উচ্চাশা থেকেই সে টাকার প্রয়োজন অনুভব করছে। বংশের সম্মান, পৈতৃক জমির পুনরুদ্ধার—সবই তার লক্ষ্য।

তবে, কলেজে যত ভদ্র হাফিজ, বন্ধুদের আড্ডায় সে ঠিক তার উল্টো। ধনীর দুলালদের বোঝাতে চাইত—সে কোনো কম বংশের নয়। বলত, "দাদার জন্যই আজ আমাদের এমন অবস্থা। বাবাকে পড়ালেখা করায়নি, আর মাকে চাকরি করতে দিত না। ফ্যামিলি এখন কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে, তবে ৪০০ বিঘা জমি ফিরে পেলেই আমরা আগের অবস্থায় ফিরব।"

তার কথা শুনে প্রতিবারের মতো রাহাত, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জমির হিসেবটা মুখস্থই করে দেখাত। কত কাঠা, কত শতাংশ—সব হিসেবই তাদের মুখস্থ। তারা জানে, তিস্তায় বাঁধ নির্মাণ হলেই তাদের জমি ফিরে আসবে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন