আমার ছেলেবেলায়, সাদাকালো টিভির যুগ। পুরো গ্রামে মাত্র দুইটা ১৬ ইঞ্চি ন্যাশনাল টেলিভিশন। সেইসময় প্রায় সবার বাড়িতেই কমবেশি পুঁথিপত্র বা বইপত্র ছিলো। দু'চার বাড়িতে পত্রিকা পড়া হতো। রেডিও আর ক্যাসেট প্লেয়ারের রাজত্বে সিনেমা শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাড়ির অদূরেই ছিলো সিনেমা হল। ছিলো হলভর্তি দর্শক। রঙ্গিন রূপবান, কাজলরেখা, সাত ভাই চম্পা আরও কত নাম! লোকেদের যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল আর গরুর গাড়িই ছিলো ভরসা। বিয়ের যৌতুক বা উপহার হিসেবে বাইসাইকেল আর রেডিও দিতে-নিতে দেখেছি অনেকবার। সরকারি লালরং ট্রেনের দুলুনি ঠিক থাকলেও আসা ও যাওয়ার সময়ের কোনো ঠিকঠিকানা ছিলো না। বুড়িমারী ছেড়ে আসা ট্রেনটা আদৌ পার্বতীপুর যাবে কিনা বা কখন যাবে? স্বয়ং লোকো মাস্টার তা জানতেন না। প্রায়শই ট্রেন পড়ে যেতো! মানে? বগির চাকা লাইনচ্যুত হতো।
যাইহোক, আজকের আলোচনার বিষয় এসব নয়।
আলোচনার বিষয় হলো একটা গায়েবি চিঠি।
আরবদেশীয় কোনো এক মসজিদের ইমাম সাহেবের স্বপ্নে নবী করিম সাঃ এসেছেন এবং বলে গেছেন সমাজে অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন পাপাচার মিথ্যাচার অনাচার বেড়ে গেছে। এসব বন্ধ করে এক আল্লাহর রেজামন্দিতে মশগুল থাকতে হবে। এই ধরনের কিছু নির্দেশনাসম্বলিত সেই চিঠির সবকিছু হুবহু মনে নেই। তবে, লিখতে গিয়ে অনেক কিছু মনে হচ্ছে। সেই চিঠিতে একটা ছবিও ছিলো। ছবিতে একজন মুসলমানের কাফন পরা লাশ পেঁচিয়ে আছে একটা ভয়ংকর সাপ!
চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, এই চিঠি পড়ার পরে অন্তত দশটি ফটোকপি করে অন্য দশজনের হাতে দিতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই এই চিঠি দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো। কেননা, যেই ব্যক্তি এই চিঠিকে অবিশ্বাস করবে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর গজব! অবিশ্বাসের কারণে অবিশ্বাসীর ছেলেপিলে মরে গেছে বলেও চিঠিতে লেখা ছিলো। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি এটা বিশ্বাস করেছে এবং কমপক্ষে দশজনের নিকট পৌঁছে দিয়েছে তাদের জন্য তিনদিনের মাথায় অপেক্ষা করছিল বিরাট প্রাপ্তিযোগ! কেউ কেউ এটার সুফল পেয়েছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ ছিলো।
বিশ্বাস অবিশ্বাস এবং ভয়ের কী চমৎকার দোলাচল ছিলো সেই গায়েবি চিঠি। আমি নিজেও দশটা ফটোকপি করেছিলাম। সম্ভবতঃ পাঁচ টাকায়। কিন্তু বিলি করতে গিয়ে দশটা লোক, মানে দশজন প্রাপক মেলে নাই! আমার হাতে সেটা কে দিয়েছিল?
তাঁকেও মনে নাই!
আলোচনাটি শেষ হলো। ধন্যবাদ।
গায়েবি চিঠি!
