একটা সময় ছিল, গ্রহটার নাম ছিল মানুষপূর—পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সূর্যের ধারে কাছেই। এই গ্রহের মানুষরা ছিল পৃথিবীর মানুষের মতোই, কিন্তু তাদের ইতিহাসে এক ভয়াবহ মোড় আসে যখন তারা এক অদ্ভুত অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাসটি তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। সেই অভ্যাসের নাম—মানুষখেকোতা।
শুরুটা হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। প্রথমে একদল বিজ্ঞানী আবিষ্কার করে বসলেন, মানুষের মাংস খেলে শরীরের ক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণে। তাদের গবেষণার ফলাফল সমাজে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। প্রথমে এই নতুন খাদ্যাভ্যাস শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ক্ষমতা, সম্পদ, এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের নতুন পন্থা হয়ে দাঁড়ায় মানুষের মাংস ভক্ষণ।
তারপর থেকে যা ঘটল, তা ছিল অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে এই ‘অভিজাত’ খাবার চুপিচুপি গ্রহণ করা হতো। ধনী, প্রভাবশালী আর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিযোগিতায় নামলো। তবে মানুষ খাওয়া তখনো কেবল একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় ছিল, যেন এটি ছিল কোনো গোপন শক্তি বাড়ানোর মন্ত্র।
কিন্তু একদিন, মানুষপূরের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী অধিকর্তা মন্ত্রী সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলো: "মানুষ মানুষের মাংস খেলে সে হবে অদম্য—অপরাজেয়। আর সেই মানুষই পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হবে।" রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে গেলো এই ঘোষণা। মানুষখেকোতা সমাজের মূলধারায় প্রবেশ করলো। ক্ষমতা দখলের নতুন মাত্রা যোগ হলো—যার হাতে মানুষ আছে, তার হাতে সব।
অল্পদিনের মধ্যেই সব নেতা, মন্ত্রী, কর্তা-ব্যক্তিরা এই নীতিতে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠল। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে—সবখানে মানুষ মানুষকে খেতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে এটিই হয়ে উঠল সবচেয়ে সহজ ও দ্রুতগতির ক্ষমতা অর্জনের পথ। পাড়া-মহল্লায়ও আর কেউ পিছিয়ে থাকলো না।
এমনকি মানুষখেকো পাঠ্যক্রম চালু হলো স্কুলগুলোতে। শিশুদের শেখানো হলো, কীভাবে ‘সুস্বাদু মানুষ রান্না’ করতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও এলো: "মানুষের কোন অংশ সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর এবং শক্তিবর্ধক?" শিক্ষার উদ্দেশ্য বদলে গেলো; মানুষ মানুষকে খেয়ে যে সভ্যতা নির্মাণ করে তার জন্য প্রস্তুত হতে হলো সবাইকে।
এরপর এল বিশ্বমানুষখেকোতা সম্মেলন। মানুষপূরের প্রভাবশালী সব রাষ্ট্র, জাতি, সম্প্রদায় একত্রিত হলো। এদের মধ্যে বৈষম্য ছিল শুধু এক জায়গায়—কে কত বেশি মানুষ খেতে পারে এবং ক্ষমতার কতটা কাছে যেতে পারে। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হলো, মানুষখেকোতা শুধু সামাজিক অভ্যাস নয়, এটি নতুন এক আদর্শ। ক্ষমতা দখলের জন্য, জাতি গঠনের জন্য মানুষকে খাওয়া হবে।
ধীরে ধীরে এই প্রথা ছড়িয়ে গেলো সবার মধ্যে। একদিন এক দল বলল, “মানুষ খাওয়াই তো বটে, তবে ভিন্নমতালম্বীদের খেলে সবচেয়ে বেশি শক্তি মেলে। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী এবং তাই তাদের মাংসেও অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকে।” এই ভাবনায় মানুষপূরের প্রতিটি মানুষ হয়ে উঠলো আরও নিষ্ঠুর, আরও হিংস্র। কারো কাছে ভিন্নমত মানেই ছিল মূল্যবান সম্পদ।
এভাবে দিন চলতে থাকলো। একের পর এক মানুষখেকোতায় সবাই মেতে উঠলো। যারা মানবাধিকারের কথা বলত, ন্যায়বিচার চেয়ে দাঁড়াত, তাদেরও সহজেই খেয়ে ফেলা হলো। কারণ শক্তির এই নতুন তত্ত্বের সামনে মানবিকতা মূর্তিমান উপহাস ছাড়া কিছুই নয়।
শেষ পর্যন্ত যা হলো তা হলো, পুরো মানুষপূর গ্রহে একজনমাত্র মানুষ অবশিষ্ট থাকলো। বাকিরা নিজেরাই নিজেদের খেয়ে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ধ্বংস করে ফেলল। শেষ মানুষটির নাম ছিল ফার্নান্ডো।
ফার্নান্ডো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। সে ছিল সেই পৃথিবীর শেষ মানুষ, যাকে খাওয়ার মতো সেখানে আর কেউ ছিল না। নির্জনতার ভেতর ফার্নান্ডো মুচকি হেসে বলল, "মানুষ তো মানুষকেই খেতে চায়। আর এখন, খাওয়ার মতো কাউকেই পেলাম না!"
শেষ মানুষ ফার্নান্ডো তার হাতের একমাত্র অস্ত্র দিয়ে নিজের রক্তে শেষ চুমুক খেলো। তারপর ফিসফিস করে বলল,
"মানুষ খেয়েছি, এখন গ্রহের পালা।"
ফার্নান্ডোর সেই শেষ চুমুকে পুরো মানুষপূর ধ্বংস হয়ে গেলো, আর সেই গ্রহের ইতিহাসে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়—"মানুষখেকোদের মহাকাব্য"।
কিন্তু গল্পটা কি এখানেই শেষ হলো? আমরা কি মানুষপূরের এই কাহিনী থেকে মুক্ত? নাকি এই পৃথিবীতে, আধিপত্যের লড়াইয়ে, ভিন্নমতের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে, আমাদের ভেতরেও- কোথাও না কোথাও মানুষখেকোতার বীজ আছে?
আছে কি?