২২ অক্টোবর, ২০২৪

মানুষখেকোদের মহাকাব্য: এক মানবিক উপাখ্যান

একটা সময় ছিল, গ্রহটার নাম ছিল মানুষপূর—পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, সূর্যের ধারে কাছেই। এই গ্রহের মানুষরা ছিল পৃথিবীর মানুষের মতোই, কিন্তু তাদের ইতিহাসে এক ভয়াবহ মোড় আসে যখন তারা এক অদ্ভুত অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাসটি তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। সেই অভ্যাসের নাম—মানুষখেকোতা।

শুরুটা হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। প্রথমে একদল বিজ্ঞানী আবিষ্কার করে বসলেন, মানুষের মাংস খেলে শরীরের ক্ষমতা বেড়ে যায় বহুগুণে। তাদের গবেষণার ফলাফল সমাজে ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। প্রথমে এই নতুন খাদ্যাভ্যাস শুধু উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ক্ষমতা, সম্পদ, এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের নতুন পন্থা হয়ে দাঁড়ায় মানুষের মাংস ভক্ষণ।

তারপর থেকে যা ঘটল, তা ছিল অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে এই ‘অভিজাত’ খাবার চুপিচুপি গ্রহণ করা হতো। ধনী, প্রভাবশালী আর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিযোগিতায় নামলো। তবে মানুষ খাওয়া তখনো কেবল একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় ছিল, যেন এটি ছিল কোনো গোপন শক্তি বাড়ানোর মন্ত্র।

কিন্তু একদিন, মানুষপূরের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী অধিকর্তা মন্ত্রী সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলো: "মানুষ মানুষের মাংস খেলে সে হবে অদম্য—অপরাজেয়। আর সেই মানুষই পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হবে।" রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে গেলো এই ঘোষণা। মানুষখেকোতা সমাজের মূলধারায় প্রবেশ করলো। ক্ষমতা দখলের নতুন মাত্রা যোগ হলো—যার হাতে মানুষ আছে, তার হাতে সব।

অল্পদিনের মধ্যেই সব নেতা, মন্ত্রী, কর্তা-ব্যক্তিরা এই নীতিতে প্রবল উৎসাহী হয়ে উঠল। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে—সবখানে মানুষ মানুষকে খেতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে এটিই হয়ে উঠল সবচেয়ে সহজ ও দ্রুতগতির ক্ষমতা অর্জনের পথ। পাড়া-মহল্লায়ও আর কেউ পিছিয়ে থাকলো না।

এমনকি মানুষখেকো পাঠ্যক্রম চালু হলো স্কুলগুলোতে। শিশুদের শেখানো হলো, কীভাবে ‘সুস্বাদু মানুষ রান্না’ করতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও এলো: "মানুষের কোন অংশ সবচেয়ে বেশি পুষ্টিকর এবং শক্তিবর্ধক?" শিক্ষার উদ্দেশ্য বদলে গেলো; মানুষ মানুষকে খেয়ে যে সভ্যতা নির্মাণ করে তার জন্য প্রস্তুত হতে হলো সবাইকে।

এরপর এল বিশ্বমানুষখেকোতা সম্মেলন। মানুষপূরের প্রভাবশালী সব রাষ্ট্র, জাতি, সম্প্রদায় একত্রিত হলো। এদের মধ্যে বৈষম্য ছিল শুধু এক জায়গায়—কে কত বেশি মানুষ খেতে পারে এবং ক্ষমতার কতটা কাছে যেতে পারে। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হলো, মানুষখেকোতা শুধু সামাজিক অভ্যাস নয়, এটি নতুন এক আদর্শ। ক্ষমতা দখলের জন্য, জাতি গঠনের জন্য মানুষকে খাওয়া হবে।

ধীরে ধীরে এই প্রথা ছড়িয়ে গেলো সবার মধ্যে। একদিন এক দল বলল, “মানুষ খাওয়াই তো বটে, তবে ভিন্নমতালম্বীদের খেলে সবচেয়ে বেশি শক্তি মেলে। কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শক্তিশালী এবং তাই তাদের মাংসেও অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকে।” এই ভাবনায় মানুষপূরের প্রতিটি মানুষ হয়ে উঠলো আরও নিষ্ঠুর, আরও হিংস্র। কারো কাছে ভিন্নমত মানেই ছিল মূল্যবান সম্পদ।

এভাবে দিন চলতে থাকলো। একের পর এক মানুষখেকোতায় সবাই মেতে উঠলো। যারা মানবাধিকারের কথা বলত, ন্যায়বিচার চেয়ে দাঁড়াত, তাদেরও সহজেই খেয়ে ফেলা হলো। কারণ শক্তির এই নতুন তত্ত্বের সামনে মানবিকতা মূর্তিমান উপহাস ছাড়া কিছুই নয়।

শেষ পর্যন্ত যা হলো তা হলো, পুরো মানুষপূর গ্রহে একজনমাত্র মানুষ অবশিষ্ট থাকলো। বাকিরা নিজেরাই নিজেদের খেয়ে, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ধ্বংস করে ফেলল। শেষ মানুষটির নাম ছিল ফার্নান্ডো।

ফার্নান্ডো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। সে ছিল সেই পৃথিবীর শেষ মানুষ, যাকে খাওয়ার মতো সেখানে আর কেউ ছিল না। নির্জনতার ভেতর ফার্নান্ডো মুচকি হেসে বলল, "মানুষ তো মানুষকেই খেতে চায়। আর এখন, খাওয়ার মতো কাউকেই পেলাম না!"

শেষ মানুষ ফার্নান্ডো তার হাতের একমাত্র অস্ত্র দিয়ে নিজের রক্তে শেষ চুমুক খেলো। তারপর ফিসফিস করে বলল,

 "মানুষ খেয়েছি, এখন গ্রহের পালা।"

ফার্নান্ডোর সেই শেষ চুমুকে পুরো মানুষপূর ধ্বংস হয়ে গেলো, আর সেই গ্রহের ইতিহাসে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়—"মানুষখেকোদের মহাকাব্য"।

কিন্তু গল্পটা কি এখানেই শেষ হলো? আমরা কি মানুষপূরের এই কাহিনী থেকে মুক্ত? নাকি এই পৃথিবীতে, আধিপত্যের লড়াইয়ে, ভিন্নমতের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে, আমাদের ভেতরেও- কোথাও না কোথাও মানুষখেকোতার বীজ আছে?

আছে কি? 


১৮ অক্টোবর, ২০২৪

রক্তমাটির বটবৃক্ষ



বটবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছে—মাটি আঁকড়ে ধরে,
শেকড় ছুঁয়েছে রক্তের ধারা, লাল মাটির রূপে।
ওরা আসে, কুড়াল হাতে, কেটে ফেলতে চায়,
তবু জানে না, এই গাছ কি সহজেই মরে যায়?

ওরা বলে, "ইতিহাস ভুলে যাও, নতুন বৃক্ষ রোপো!"
কিন্তু কীভাবে ভুলবে? শেকড় তো মাটির রসেই ভিজে।
ত্রিশ লাখ পাতা ঝরে পড়েছিল একদিন,
তাদের রক্তে শেকড় আজও জ্যান্ত—তুমুল বেদনায় কাঁদে।

ওরা চায় শিকল পরাতে, বটবৃক্ষের ডালে,
"মুছে দাও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর কথা ফেলে।"
কিন্তু বাতাসে যখন শ্বাস নেয় পাতা,
তখনও বাজে জয় বাংলার মন্ত্র, জেগে ওঠে আত্মা।

ওরা কুড়াল চালায়, তবু গাছটা রক্ত ঝরায় না,
ওরা জানে না, এ বৃক্ষ শেকড়ের গহীনে থাকে,
বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে শেকড় জেগে ওঠে দুর্নিবার,
পতাকা উড়ে, সবুজ পাতায় লাল সূর্যের বার্তা।

শকুনেরা আকাশে উড়ে, কিন্তু ছায়া তাদের ছুটে যায়,
এই গাছের ছায়ায় মাটি আর মানুষ মিলে হয় একাকার।
যতখুশি তোমরা ছুরি চালাও, কিন্তু মুছে ফেলতে পারবে না,
এ গাছের শেকড় চিরকালীন, এ গাছ অক্ষয় অমর।

তোমাদের ষড়যন্ত্র বালুর বাঁধের মতো ভাঙবে,
এই গাছের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে মুক্তির ইতিহাস,
এ গাছ মরে না, এ গাছ থেকে জন্ম নেয় নতুন স্বাধীনতা—
যে স্বাধীনতা কাটতে চাও, তাতে তোমার হাতে ফুটবে কাঁটা।

এক হও, এক হও


এক হও, এক হও!
এক হও, বলছে নেতারা,
তাদের বজ্রকন্ঠী আওয়াজে-
যখনই কাঁপলো মুক্তির বীজ,
তখন, বিভাজনের তালা খুলছে!
একত্বের মাঝে চাপা পড়লো যত তাঁতি।
এক একটি দেহে দুটি হৃদয়,
স্বার্থের লড়াইয়ে ভাসে কথার স্রোত,
প্রেমের সুরে বাঁধা পড়ে সুর,
রক্তের গন্ধে দ্বিধা-বিভক্ত এ জাতি।
ফুলে ফুলে হাসির রং,
কিন্তু কী সুর উঠেছে সুরে?
একতার গান, আড়ালে গোপন আঁতাত, 
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, মঞ্চে কেবলই অভিনয়।
শতভাগ হীন স্বার্থের তরে,
মিলনের বাজারে প্রেমের চাহিদা বাড়ে,
বন্ধুত্বের দাম ওঠে সোনালী রঙের পাতে,
শুনি নির্লজ্জ অট্টহাসি, দেখি শূন্যতার ফাঁকা শেকড়।
বুকে প্রেমের তাড়না, কিন্তু ঘৃণা আছড়ে পড়ে তটে,
মানুষের নামী-দামি স্বপ্নে কিংবা চোখে চোখ রেখে, 
একটা একটা করে মানুষ বোঝার কৌশল খুঁজে,
কারোর অন্তর বোঝা—এটা তো কেবলই শব্দের খেলা।
তোমরা এক হও, এক হও বলো, কিন্তু কেমনভাবে?
নেতৃত্বের নতুন খেলায়, জনগণের অদম্য উচ্ছ্বাস,
কিন্তু সবকিছুই শেষ হয়ে যায়, নিষ্পাপ রক্তপাতের মাঝে,
প্রেমের বার্তা হায়, বারেবারে ব্যর্থতার গ্লানিতে পর্যুদস্ত হয়।

১৭ অক্টোবর, ২০২৪

এই ক্ষুদ্র আমি

সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েছি, দেখেছি তার বিশালতাকে।
নদীর কাছে গিয়ে তাকিয়ে থেকেছি তার স্রোতের গভীরে।
বয়োবৃদ্ধ বটগাছটির নিচে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি আমার ক্ষুদ্রতা।
উড়ন্ত গাঙচিলের ডানায় দেখেছি অবাধ উচ্ছ্বাস,
ঘাসফড়িংয়ের লাফে আর জোনাকিপোকার আলোর ঝিলিকেও দেখেছি স্বাধীনতার উচ্ছ্বলতা।
নিজের ডালে সৌরভ বিলানো গোলাপকে দেখেছি; আহা, সে কী সহজে স্বাধীন!
আমি সাপ, ব্যাঙ, কাক, কুকুর—প্রত্যেককেই দেখেছি।
অতিকায় হস্তী আর তেলাপোকাও চোখে পড়েছে।
এমন কিছু মানুষও দেখেছি, যারা মানুষের নামেই পরিচিত অথচ মানুষের চেয়ে বেশি, কমিন!
নদী, সমুদ্র, বট, গাঙচিল, ঘাসফড়িং, জোনাকিপোকা, প্রিয় গোলাপ,
আমি তাদের সঙ্গেই একাত্ম হতে চাই—এই ক্ষুদ্র আমি।
তোমরা আমায় সাপ, ব্যাঙ, কাক, কুকুর, হস্তী কিংবা তেলাপোকার হাতে তুলে দাও,
কিন্তু ঐসব মানুষের হাতে নয়, যারা মানুষ নামের মিথ্যা পরিচয়ে লুকিয়ে রেখেছে তাদের করুণ স্বার্থপরতা!

১৩ অক্টোবর, ২০২৪

রক্তের দাম

 মাটির নিচে শুয়ে শুয়ে ওরা শোনে
প্রতিবাদী পায়ের শব্দ, থমকে যাওয়া শ্বাস,
ওরা শোনে ক্ষোভের গান—
বাতাসে ভেসে আসে হাহাকার, বেদনাবিধুর রাগিণী।
সেই কবে ভাঙা বুকের রক্তে বুনে দিল
স্বাধীনতার বীজ,
তবুও কেন এই বর্ণমালা আজ বিষের তরে ঝরে,
রক্তে ভেজা ধূলিমাটি কি শুধু স্মৃতির মালা বয়ে বেড়াবে?
হায়েনাদের থাবায় ইতিহাস হয় কালো,
মুছে যায় সূর্যের রোদে লেখা সেই সুরের কাব্য,
সোনালী ফসলের মাঠে দাঁড়িয়ে আজ
বিধ্বস্ত মা-বোনের আর্তি, ব্যথা আর অভিশাপ।
আমার বুকের রক্তে লেখা সে গল্প—
জীবনের বিনিময়ে কেন হার মানবে?
যে পায়ের তলে পিষ্ট হবে সব মিথ্যের মোড়ক,
ওঠে দাঁড়াও, ফিরে আসুক সেই আদিম চেতনার শপথ।
আমার শিরা, আমার রক্ত, আমার মুক্তির গান
ফিরে আসবে প্রতিধ্বনি হয়ে—
বেঁচে থাকবে একদিন রক্তের দাম
শুধু স্মৃতির ছায়ায় নয়,
জীবনের জ্বলন্ত বেদিতে।
রক্তের দাম
______________রশিদ ভাই
তেরো দশ চব্বিশ।

গায়েবি চিঠি

 আমার ছেলেবেলায়, সাদাকালো টিভির যুগ। পুরো গ্রামে মাত্র দুইটা ১৬ ইঞ্চি ন্যাশনাল টেলিভিশন। সেইসময় প্রায় সবার বাড়িতেই কমবেশি পুঁথিপত্র বা বইপত্র ছিলো। দু'চার বাড়িতে পত্রিকা পড়া হতো। রেডিও আর ক্যাসেট প্লেয়ারের রাজত্বে সিনেমা শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বাড়ির অদূরেই ছিলো সিনেমা হল। ছিলো হলভর্তি দর্শক। রঙ্গিন রূপবান, কাজলরেখা, সাত ভাই চম্পা আরও কত নাম! লোকেদের যাতায়াতের জন্য বাইসাইকেল আর গরুর গাড়িই ছিলো ভরসা। বিয়ের যৌতুক বা উপহার হিসেবে বাইসাইকেল আর রেডিও দিতে-নিতে দেখেছি অনেকবার। সরকারি লালরং ট্রেনের দুলুনি ঠিক থাকলেও আসা ও যাওয়ার  সময়ের কোনো ঠিকঠিকানা ছিলো না। বুড়িমারী ছেড়ে আসা ট্রেনটা আদৌ পার্বতীপুর যাবে কিনা বা কখন যাবে? স্বয়ং লোকো মাস্টার তা জানতেন না। প্রায়শই ট্রেন পড়ে যেতো! মানে? বগির চাকা লাইনচ্যুত হতো। 


যাইহোক, আজকের আলোচনার বিষয় এসব নয়। 

আলোচনার বিষয় হলো একটা গায়েবি চিঠি। 


আরবদেশীয় কোনো এক মসজিদের ইমাম সাহেবের স্বপ্নে নবী করিম সাঃ এসেছেন এবং বলে গেছেন সমাজে অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন পাপাচার মিথ্যাচার অনাচার বেড়ে গেছে। এসব বন্ধ করে এক আল্লাহর রেজামন্দিতে মশগুল থাকতে হবে। এই ধরনের কিছু নির্দেশনাসম্বলিত সেই চিঠির সবকিছু হুবহু মনে নেই। তবে, লিখতে গিয়ে অনেক কিছু মনে হচ্ছে। সেই চিঠিতে একটা ছবিও ছিলো। ছবিতে একজন মুসলমানের কাফন পরা লাশ পেঁচিয়ে আছে একটা ভয়ংকর সাপ!


চিঠির নির্দেশনা অনুযায়ী, এই চিঠি পড়ার পরে অন্তত দশটি ফটোকপি করে অন্য দশজনের হাতে দিতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই এই চিঠি দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো। কেননা, যেই ব্যক্তি এই চিঠিকে অবিশ্বাস করবে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর গজব! অবিশ্বাসের কারণে অবিশ্বাসীর ছেলেপিলে মরে গেছে বলেও চিঠিতে লেখা ছিলো। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি এটা বিশ্বাস করেছে এবং কমপক্ষে দশজনের নিকট পৌঁছে দিয়েছে তাদের জন্য তিনদিনের মাথায় অপেক্ষা করছিল বিরাট প্রাপ্তিযোগ! কেউ কেউ এটার সুফল পেয়েছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ ছিলো। 


বিশ্বাস অবিশ্বাস এবং ভয়ের কী চমৎকার দোলাচল ছিলো সেই গায়েবি চিঠি। আমি নিজেও দশটা ফটোকপি করেছিলাম। সম্ভবতঃ পাঁচ টাকায়। কিন্তু বিলি করতে গিয়ে দশটা লোক, মানে দশজন প্রাপক মেলে নাই! আমার হাতে সেটা কে দিয়েছিল? 

তাঁকেও মনে নাই!


আলোচনাটি শেষ হলো। ধন্যবাদ। 


গায়েবি চিঠি!

সময়

 একটা অফিসে কাজ করতেন জনাব গোলাম ফারুক। অফিস সহকারী হিসেবে শুরু করেছিলেন চাকরি, শেষও করেছিলেন সেখানেই। সারাজীবন এক পদে থেকে গেলেন, তবুও কারো কোন মাথাব্যথা নেই। অফিসে বড় কর্তারা যখন পদোন্নতির জন্য বৈঠক করতেন, তখন ফারুক সাহেব চুপচাপ তার ফাইল গুছিয়ে চলতেন। তিনি জানতেন, এই বৈঠক তার জন্য নয়। কেনই বা হবে? তিনি তো আর বড় কর্মকর্তা নন!

কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। তার অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের সহকর্মীরা বড় বড় স্বপ্ন দেখেন, বিভিন্ন ফাঁক গলে উপরের চেয়ারে বসে যান। কিন্তু গোলাম ফারুকের মতো ছোট পদে কাজ করা কর্মচারীদের নিয়ে ভাবার অতো সময় তাদের নেই। সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে কথা বলে, অথচ একবারও ভাবেন না, "আচ্ছা, এই অফিসের সব কর্মচারীর জন্য একসাথে কিছু করলে কেমন হয়?" না, সেটি তাদের মাথায় আসে না। সবাই যেন একেকটা আলাদা রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত।

একদিন এক কর্মচারী ফারুক সাহেবকে জিজ্ঞাসা করল, "আপনার তো পদোন্নতি হয়নি, কেন আন্দোলন করছেন না?" 

ফারুক সাহেব হেসে বললেন, "বাবা, আন্দোলন করতে হলে তো আগে মাথায় চিন্তা আসতে হবে! আমার যা মাথাব্যথা, সেটা শুধু অফিসের ফাইল নিয়েই। আর চিন্তা? সেটা কবে কার এসেছে?"

কর্তারা বড় বড় নীতির কথা বলেন। "সবার জন্য সমান সুযোগ চাই! বৈষম্য দূর করতে হবে!" কিন্তু এসব কথা কেবল কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে? পদোন্নতি তো দূরে থাক, ছোট কর্মচারীদের ভালো ভাতার কথাই কারো মনে আসে না। আর যদি কেউ মুখ খুলে বলে, তখন বড় কর্তারা হেসে বলেন, "আরে, তোমাদের জন্য তো কিছু চিন্তা করা হচ্ছে, সময় আসলে সব হবে!" 

এই ‘সময়’ ব্যাপারটাই যেন একটা রসিকতা। কর্মচারীদের জীবনের সব সমস্যার সমাধান ‘সময়’ দিয়ে হবে—শুধু সেই সময়টা কখন আসবে কেউ জানে না। 

একদিন অফিসের কর্তারাও এভাবে সময়ের অপেক্ষায় থাকবেন। তখন কেউ বলবে, "আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, সব ঠিক হয়ে যাবে!" ততদিনে হয়তো ফারুক সাহেবের মতোই নতুন এক কর্মচারী সেই কথাগুলো শুনে মাথা নাড়বেন, কিন্তু তার জীবনেও কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ, তারাও তো একই নাটকের পাত্র! 


এটাই হয়তো সমাজের আসল সমস্যা—সবাই নিজের জন্য ভাবে, কিন্তু সম্মিলিতভাবে সকলের ভালো কামনা করার চিন্তা কারো মাথায় আসে না। এভাবেই চলবে, আর কর্মচারীরা থেকে যাবে "কলুর বলদ", যাদের কপালে কিছু নেই, শুধু "সময়" নামক এক স্বপ্নের বাকি!


সময়

___________ রশিদ ভাই 

দুই দশ চব্বিশ